সিলেটে যে দুই চিকিৎসক’কে নিয়ে তোলপাড়! | তদন্ত রিপোর্ট

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০০ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি:

জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট পত্রিকায় সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে।

সিলেটে যে দুই চিকিৎসক’কে নিয়ে তোলপাড়!

সিলেটে যে দুই চিকিৎসক’কে নিয়ে তোলপাড়!

Manual3 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদেক: চিকিৎসা পেশাকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম মহৎ ও পবিত্র একটি ব্রত। একজন চিকিৎসক যখন তার চেম্বারে বসেন, তখন সেবাপ্রত্যাশী মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন স্রষ্টার প্রেরিত ত্রাতা। কিন্তু সেই পবিত্র সাদা অ্যাপ্রনের আড়ালে যদি লুকিয়ে থাকে চরম নৈতিক অবক্ষয়, প্রতারণা এবং পাশবিক লালসা, তবে তা কেবল একটি পেশাকেই নয়, বরং সমগ্র সমাজব্যবস্থাকেই তীব্র ঝাঁকুনি দেয়।

Manual4 Ad Code

সিলেটের সোবহানীঘাটস্থ প্রাইম হাসপাতালের দুই চিকিৎসক ডা. মো. জাকির হোসাইন এবং ডা. নাজিফা ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি ঠিক তেমনই এক ন্যাক্কারজনক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে শুরু করে অভিজাত আবাসিক হোটেল সবখানেই নিজেদের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার এক ঘৃণ্য ইতিহাস রচনা করেছেন তারা।

Manual2 Ad Code

দীর্ঘ ৬ মাসের তদন্ত রিপোর্টের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা তথ্য আবার নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওচিত্র প্রমাণ করছে, এটি নিছক কোনো ভুল নয়, বরং সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক নৈতিক স্খলন। অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত ডা. মো. জাকির হোসাইন ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জনক। তার স্ত্রী মরিয়ম আক্তার নিজেও পেশায় একজন চিকিৎসক। নিজের চিকিৎসক স্ত্রী, দুই সন্তান এবং সাজানো সংসারের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে ডা. জাকির তার অবিবাহিত সহকর্মী ডা. নাজিফা ইসলামের সঙ্গে গড়ে তোলেন এক অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্ক। প্রাইম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় বসে দিনের পর দিন চলেছে তাদের এই বেহায়াপনা।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্যমতে, সেবাপ্রত্যাশী অসুস্থ রোগীরা যখন ডা. জাকিরের চেম্বারের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যন্ত্রণায় অপেক্ষার প্রহর গুনতেন, ঠিক সেই সময়ে চেম্বারের ভেতরে ডা. নাজিফাকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনৈতিকতায় থাকতেন তিনি। সম্প্রতি কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছানো সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, চেম্বারের ভেতর কেবল এই দুজনের আপত্তিকর উপস্থিতি। রোগীদের জীবন বাঁচানোর শপথ নেওয়া দুই চিকিৎসক কীভাবে রোগীদেরই জিম্মি করে নিজেদের লালসা পূরণে চেম্বারকে ব্যবহার করেছেন, তা চিকিৎসা পেশার ইতিহাসে এক চরম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

চেম্বারের চার দেয়াল পেরিয়ে তাদের এই অনৈতিক সম্পর্ক গড়ায় সিলেটের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে। বিগত (০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩০ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত) তদন্ত রিপোর্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘ ছয় মাসের অনুসন্ধানে ওঠে আসে, স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে সিলেটের আনাচে-কানাচে তারা গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের অভয়ারণ্য। এই ১৮০ দিনের পরিসংখ্যানে তাদের মিলিত হওয়ার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে শিউরে তুলবে।

অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, বিগত ছয় মাসে তারা- সোবহানীঘাটস্থ করিম হোটেলে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে অবস্থান করেছেন সর্বোচ্চ ৯৫ বার, এয়ারপোর্ট রোডের দরগাহগেটস্থ ‘হোটেল দরগাহগেট’-এ অবস্থান করেছেন ৩২ বার, মৌ রোডের এনআইডি শোভা রেসিডেন্সিয়াল হোটেলে একত্রিত হয়েছেন ৬ বার, পর্যটন হোটেল ও রেস্টুরেন্টের পাশে পর্যটন হিলে সময় কাটিয়েছেন ৪ বার, তালতলাস্থ হোটেল শাহবান লিমিটেডে অবস্থান করেছেন ১ বার। এমনকি, ডা. নাজিফার ব্যক্তিগত বাসা (মজুমদার পাড়া আর/এ, মঈনুদ্দিন আদর্শ মহিলা কলেজের কাছে, বাগবাড়ি)-তে বিগত ছয় মাসে ডা. জাকির হোসেন অন্তত ২০ বার অবস্থান করে একান্ত সময় কাটিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, এটি কোনো আকস্মিক পদস্খলন ছিল না, বরং অত্যন্ত সুকৌশলে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে আইনের চোখে ধুলো দিয়ে চালানো এক দীর্ঘমেয়াদি প্রতারণা।

তাদের এই লাগামহীন বেলেল্লাপনার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে গত ১৯ আগস্ট (বুধবার)। সিলেটের অন্যতম অভিজাত ‘উইন্ডসর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস’-এ যথারীতি ভুয়া স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রুম ভাড়া নেন এই চিকিৎসক জুটি। দুপুর ১২টায় হোটেলে প্রবেশ করে রাত ৯টা ২০ মিনিট পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ ঘণ্টারও বেশি সময় তারা সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষে অবস্থান করেন। কিন্তু এবার আর শেষ রক্ষা হয়নি। লোকলজ্জার ভয়ে মুখ ঢেকে, চোরের মতো তড়িঘড়ি করে হোটেল থেকে বেরিয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে তাদের পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ে যায় ক্যামেরায়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ভাইরাল হয়ে যায় এবং সিলেটসহ সারাদেশের সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। যেকোনো অপরাধ প্রকাশ্যে আসার পর অপরাধীর মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনা কাজ করার কথা থাকলেও, ডা. জাকির হোসাইনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে চরম ধৃষ্টতা।

Manual6 Ad Code

ঘটনার বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীর প্রতি চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। ফোনে তিনি দম্ভের সাথে বলেন, আপনি আগে আমার সাথে দেখা করুন। কোথায় দেখা করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি “সিলেট প্রেসক্লাবে” আসার নির্দেশ দেন। একজন নৈতিক স্খলনে অভিযুক্ত চিকিৎসক কীভাবে সিলেট প্রেসক্লাবের মতো একটি পবিত্র ও স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন, তা নিয়ে নতুন করে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে, গতকাল রবিবার (৩০ আগস্ট) দুপুর ১টা ৩৪ মিনিটে আরেক অভিযুক্ত ডা. নাজিফা ইসলামের সেলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন বন্ধ রেখে আত্মগোপনের পথ বেছে নিয়েছেন।

এই কেলেঙ্কারি কেবল দুজন চিকিৎসকের নৈতিক স্খলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চরম দুর্বলতাকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। প্রথমত, উইন্ডসর বা করিম হোটেলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে দিনের পর দিন ভুয়া পরিচয়ে নারী-পুরুষকে রুম ভাড়া দিল? তাদের নিরাপত্তা যাচাই ও তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা কি এতটাই ঠুনকো? নাকি অর্থের বিনিময়ে তারা জেনেশুনেই এই অবৈধ ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছে? উইন্ডসর হোটেলের ম্যানেজারের ফোন রিসিভ না করার বিষয়টি তাদের পরোক্ষ অপরাধবোধকেই ইঙ্গিত করে। দ্বিতীয়ত, প্রাইম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এখানে চরম রহস্যজনক। দিনের পর দিন চেম্বারে এমন অনাচার চলার পরও তারা কেন নীরব ছিলেন?

Manual4 Ad Code

সার্বিক বিষয়ে প্রাইম হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. আশরাফের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত দায়সারা গোছের উত্তর দেন। ভিডিও ক্লিপ দেখার কথা স্বীকার করলেও তিনি বলেন, “কতটুকু সত্যি বা মিথ্যা তা জানি না… প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভাইরাল ভিডিওর মতো অকাট্য প্রমাণের পরও কর্তৃপক্ষের এই ‘প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেব’ নীতি মূলত অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ারই শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চিকিৎসকরা সমাজের আয়না। তাদের কাছে মানুষ যায় জীবন বাঁচাতে, ভরসা পেতে। সেই আস্থার জায়গাটিকে কলঙ্কিত করে ডা. জাকির ও ডা. নাজিফা যে পাশবিক ও সমাজ বিধ্বংসী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছেন, তা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়। সচেতন মহলের জোর দাবি, অবিলম্বে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্তদের ডাক্তারি লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা। একইসঙ্গে, যে সকল হোটেল কর্তৃপক্ষ টাকার বিনিময়ে এই অবৈধ কাজের সুযোগ করে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসা সেবার মতো মহান পেশা চিরতরে তার পবিত্রতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments are closed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code